প্রয়াত অভিনেত্রী শ্রীলা মজুমদার

Read Time:6 Minute

সৌরভ দত্ত : প্রয়াত অভিনেত্রী শ্রীলা মজুমদার। জরায়ুতে ক্যানসার রোগ বাসা বেঁধেছিল তাঁর। দীর্ঘ দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। শেষে শনিবার দুপুরে হার মানলেন মারণ রোগের কাছে। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। দুপুর আড়াইটে নাগাদ কলকাতায় টালিগঞ্জে নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অভিনেত্রী। মৃ্ত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তাঁর মত দাপুটে অভিনেত্রীর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ টলিউড। তাঁকে বাংলার স্বর্ণযুগের অভিনেত্রী বললেও অত্যুক্তি হয় না। কাজ করেছেন বাংলা থেকে শুরু করে হিন্দি বিনোদুনিয়ার বিভিন্ন নামীদামি অভিনেতাদের সঙ্গে। শ্রীলা মজুমদার যে, টলিউডের ব্যতিক্রমী অভিনেত্রী, তা বোধহয় আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। মৃণাল সেনের হাত ধরে মাত্র ১৬ বছর বয়সে অভিনয় কেরিয়ার শুরু করেন শ্রীলা। তারপর থেকে একের পর এক ছবিতে নিজের অভিনয়গুণে মুগ্ধ করে গিয়েছেন অভিনেত্রী। নাটকের মহড়া থেকে শ্রীলা মজুমদার কে প্রথম আবিষ্কার করেন মৃণাল সেন। ১৯৮০ সালে তাঁর ছবিতেই সিনেজগতে আত্মপ্রকাশ করেন। আর শ্রীলার শেষ সিনেমা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পালান’। এ যেন একেবারে বৃত্তপূরণ। শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ, স্মিতা পাটিলের সঙ্গেও কাজ করেছেন শ্রীলা মজুমদার।‌ ২০০৩ সালে তিনি ‘চোখের বালি’ সিনেমায় ঐশ্বর্য রাই বচ্চনের জন্য বাংলায় ডাবিংও করেছিলেন তিনি। টলিপাড়ার অনেকেরই আক্ষেপ, এত দক্ষ অভিনেত্রী হওয়া সত্ত্বেও যোগ্য জায়গা পাননি তিনি। একেবারে নিঃশব্দেই চলে গেলেন । তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে পরশুরাম, এক দিন প্রতিদিন, অকালের সন্ধানে, খারিজ, চোখ, আরোহণ, মান্দি, শংকর মুদি, দামুল, ফিরিয়ে দাও প্রভৃতি। শৈশবেই হারিয়েছিলেন বাবা রামচন্দ্র মজুমদার। মা ননী মজুমদার একাই বড় করে তোলে শ্রীলাকে। তিনিই যেন ছিলেন অভিনেত্রীর একমাত্র বন্ধু। মাকে কেন্দ্র করেই যেন আবর্তিত ছিল তাঁর জীবন। স্কুলে পড়াকালীনই বাচিক শিল্পী হিসাবে কাজ করেছেন শ্রীলা। তাঁর কণ্ঠ শোনা যেত একাধিক জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনে। অভিনয় টানত না তাঁকে। আলোকবৃ্ত্তের বাইরেই যেন স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। মৃণাল সেনের হাত ধরে অভিনয় জগতে আসেন শ্রীলা। কিংবদন্তি পরিচালকের ‘পরশুরাম’ হাত ধরে অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন তিনি। তার পর আর পিছনে ফিরে তাঁকাতে হয়নি তাঁকে। ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘খারিজ’, ‘চোখ’, ‘মান্ডি’-র মতো বিখ্যাত সব ছবিতে শ্রীলার অভিনয় শিল্পী হিসাবে তাঁরে আরও এগিয়ে দেয়। মৃণাল সেন থেকে শ্যাম বেনেগাল, অপর্ণা সেন, বিখ্যাত সব পরিচালকদের পছন্দের তালিকায় শ্রীলার নাম থাকত শীর্ষেই। প্যারালাল ছবির পাশাপাশি বাণিজ্যিক ছবিতেও চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। অঞ্জন চৌধুরীর ‘পূজা’, হরনাথ চক্রবর্তীর ‘প্রতিবাদ’ গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের “মহলের ঘোড়া” এর মতো বাণিজ্যিক ছবিতে সমান ভাবে সাবলীল ছিলেন শ্রীলা। শুধু তাই নয়। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’-তে ঐশ্বর্য রাই বচ্চনের হয়ে ডাবিং করেছিলেন তিনি। দর্শকমহলে প্রচুর প্রশংসাও কুড়িয়েছিলেন। অভিনেত্রী হিসাবে শ্রীলা কতটা দক্ষ ছিলেন, তা আর মনে করিয়ে দিতে হয় না। কিন্তু অভিনেত্রীর ঘনিষ্ঠ মহলের অনেকেই মনে করেন, টলিউডে তাঁর প্রাপ্য জায়গাটি কখনও পাননি তিনি। সময়ের সঙ্গেই কমে আসে তাঁর ছবির সংখ্যা। ছোট পর্দায় যদিও বেশ কয়েকটি কাজ করেন তিনি। জাঁকজমকের পার্টিতেও খুব বেশি দেখা যেত না প্রচারবিমুখ শ্রীলাকে। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে শেষ ছবিটি করেছিলেন তিনি। ‘পালান’-এ একটি চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ২৭ জানুয়ারি রাতেই হবে শ্রীলা মজুমদারের শেষকৃত্য। বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডেলে মুখ্যমন্ত্রী পোস্ট করেছেন, “আজ বিকেলে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শ্রীলা মজুমদারের মৃত্যু সংবাদে শোকাহত। শ্রীলা ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য এবং শক্তিশালী অভিনেত্রী যিনি বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। এটি বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা তার অনুপস্থিতি অনুভব করব। তাঁর পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *