নির্বাচন বছরে CAA ইস্যু শুধুই একটা পলিটিক্যাল গিমিক

Read Time:8 Minute

24 Hrs Tv:নিজস্ব প্রতিনিধি : সিএএ বা সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কবে থেকে বাংলা সহ গোটা দেশজুড়ে লাগু হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে জোর চর্চ্চা। লোকসভা নির্বাচনের বছরে এই আবহে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ CAA ইস্যুতে কংগ্রেসকে চাঁছাছোলা ভাষায় আক্রমণ করেছেন। শনিবার দিল্লিতে গ্লোবাল বিজনেস সামিটে দাঁড়িয়ে অমিত শাহ বলেন, ‘কংগ্রেস সরকার একসময় সিএএ লাগুর আশ্বাস দিয়েছিল। কংগ্রেসই শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। এখন তারা অন্য কথা বলছে’। এদিন যেভাবে অমিত শাহ CAA ইস্যুতে কংগ্রেসকে নিশানা করেছেন এর পিছনের ইতিহাস কম নয়।

২০১৭ সালে চাকমাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রশ্নে সংসদে অরুণাচলের কংগ্রেস এমপি নিনং এরিং প্রস্তাবের তুমুল বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, স্থানীয় উপজাতিদের জমিজমা আর সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতেই চাকমাদের নাগরিকত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, অরুণাচলের বিজেপি সাংসদ কিরেন রিজিজু নিজে ওইসময় সংসদে হাজির থাকলেও অরুণাচলে বসবাসকারী চাকমাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রশ্নে তিনিও নীরব ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম ছাড়া সব ধর্মের লোককে ভারতীয় নাগরিকত্ব দিতে মোদী সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ তা ফলাও করে প্রচার হলেও, অরুণাচলে চাকমাদের ক্ষেত্রে এই সুবিধে দিতে তীব্র আপত্তি রাজ্যের কংগ্রেস বা বিজেপি, সব দলেরই।ফলে ভারতের সবচেয়ে পূর্বপ্রান্তের রাজ্য অরুণাচলে গত পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে বেশ কয়েক হাজার চাকমা আজও শরণার্থীর মতো দিন কাটাচ্ছেন।সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তাদের কারও কারও ভোটাধিকার মিললেও এই চাকমাদের নেই কোনও আধার কার্ড কিংবা জমিজমা কেনার অধিকার।

আশির দশকেও কাতারে কাতারে চাকমা হিংসায় জর্জরিত হয়ে প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে ভারতের ত্রিপুরায় চলে আসেন। ১৯৮৭তে মাত্র দুসপ্তাহের মধ্যে ৪৫ হাজার চাকমা শরণার্থী ত্রিপুরায় ঢুকে শিবিরে পরে। ত্রিপুরার বাম সাংসদ জিতেন্দ্র চৌধুরী এই ইস্যুতে একসময় বলছিলেন, ‘ত্রিপুরায় যে চাকমারা আছেন তারা তফসিলি উপজাতিভুক্ত বলে গণ্য এবং ভারতের নাগরিক হিসেবে সেখানে সব সুযোগ-সুবিধাই তারা পান। ত্রিপুরাতে তাদের কোনও সমস্যা নেই’। ‘এমন কী মিজোরামেও সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী সে রাজ্যে চাকমাদের জন্য একটি অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল বা স্বশাসিত পরিষদ গঠিত হয়েছে। ফলে সেখানেও তাদের অধিকার সুরক্ষিত বলা যেতে পারে’। অরুণাচল প্রদেশে চাকমাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ইস্যুতে সমস্যা কোথায়? এর জবাবে জিতেন্দ্র চৌধুরী বলেছিলেন,’রাজ্যে যে চাকমারা আছেন তাদের কখনেই অরুণাচল প্রদেশের সরকার নাগরিকত্ব দিতে রাজি হয়নি। আর যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের সবারই একই নীতি। আর এ কারণেই সেখানে চাকমারা আজ এত বছর পরেও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়ে গিয়েছেন’।

এদিন অমিত শাহ অত্যন্ত জোরের সঙ্গে কংগ্রেস সরকারকে CAA লাঘু না করার বিষয়ে কাঠগড়ায় তুলে বেশ কয়েক বছর আগে এই ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থানকে সামনে এনে কংগ্রেসকে বেআব্রু করে দিয়েছেন। একদা চাকমাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রশ্নে রীতিমতো ক্ষেপে ওঠেন অরুণাচল প্রদেশের কংগ্রেস সাংসদ তথা বর্ষীয়ান রাজনীতিক নিনং এরিং। তিনি পরিষ্কার বলেন, এটা কোনও মতেই মানা সম্ভব নয়। এরিংয়ের কথায়, ‘একবার নাগরিকত্ব পেলেই এই চাকমারা স্থানীয় উপজাতিদের সর্বনাশ ডেকে আনবে। অরুণাচলের যারা ভূমিপুত্র, তারা বংশপরম্পরায় যে জমিজমা চাষ করে এসেছেন সেটা চাকমাদের কাছে খোয়াবেন’। অরুণাচলের উপজাতিদের নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি-মূল্যবোধকে ‘বাইরের বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্যই’ এটা প্রয়োজন এবং ‘অরুণাচলে থাকতে হলে চাকমাদের শরণার্থী হয়েই থাকতে হবে’, এ কথাও নিঃসঙ্কোচে বলেন এরিং। উল্লেখ্য যে,অরুণাচল প্রদেশে ঢোকার জন্য ভারতীয়দেরও ‘ইনার লাইন পারমিট’ লাগে। সেই পারমিট ছাড়াই চাকমারা রাজ্যে ঢুকেছিল, সে কথাও মনে করিয়ে দেন।

১৯৬০’র দশকে তখনকার পূর্ব পাকিস্তান থেকে কাপ্তাই জলাধারের কারণে ভিটেমাটি হারিয়ে যে চাকমারা ভারতে এসেছিলেন, তাদের একটা অংশ কেন এখনও পূর্ণ নাগরিকত্ব পাননি, ভারতের পার্লামেন্টে প্রশ্ন উঠেছিল। গবেষকরা বলেন, কাপ্তাই লেকের কারণে ৬৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়েছিল, যার মধ্যে ২২ হাজার হেক্টরই ছিল কৃষিজমি। বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন প্রায় ১ লক্ষ উপজাতীয়, যাদের মধ্যে ৭০ শতাংশই ছিলেন চাকমা। এরই সঙ্গে ১৯৭২য়ে শান্তিবাহিনী গঠিত হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান থেকে পালিয়ে প্রাণে বাঁচতে ভারতে ঢুকে পরে তারা। ভারতে আসা এই চাকমাদের অনেকেই আর কখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে ফিরে যাননি। তাদের ধীরে ধীরে পুনর্বাসন করা হয়েছে ত্রিপুরা, মিজোরাম। কিন্তু গোল বেঁধেছে অরুনাচল প্রদেশে।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে ভারতে আসা এই চাকমারা মূলত ত্রিপুরা, মিজোরাম ও অরুণাচল প্রদেশ উত্তর-পূর্ব ভারতের এই তিনটি রাজ্যে থাকেন। ত্রিপুরা ও মিজোরামে তারা সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পেলেও অরুণাচলে তারা এখনও প্রায় শরণার্থীর জীবনই যাপন করছেন। এদিন অমিত শাহের আশ্বাস, ‘CAA কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে কোথাও একথা বলা নেই। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান থেকে আসা নিপীড়িত শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দিতে এই আইন’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *