বাঘমামার অস্তিত্বের টানাপোড়নের লড়াই,কাহিনী নয় সত্যি

Read Time:6 Minute

24HrsTv ওয়েব ডেস্ক : রেশমি খাতুন : হালুম! হালুম! শব্দটির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। সে আর কেউ নয় বনের রাজা বাঘমশাই ! কথায় আছে বিড়াল নাকি বাঘের মাসি। তবে তাতে মোটেও পাত্তা দেন না বাঘ। কিংবা গায়ে পড়ে বাঘ তার মাসির সাথে ঝগড়াও করতে যান না। অনেকেই বাঘকে ভালোবেসে আদর করে মামা বলে ডেকে থাকেন। তাতেও কিছু মনে করেন না বাঘ মামা। বুক ফুলিয়ে হাঁটে সে, কেননা সে হল রয়েল বেঙ্গল টাইগার। হুঙ্কার ছেড়ে হাঁটে সে। তবে বর্তমানে বাঘ মানুষজনদের থেকে নিজেকে আড়াল করতে শিখে গেছে। একটা সময় ছিল যখন বাঘেদের রাজত্ব বেশ রমরমা ছিল। বাঘের গর্জনে মানুষ আতঙ্কে থাকতো সবসময়। যত দিন যায় ততই বিলুপ্তির পথে বাঘ। এখন একটি বিপন্ন প্রজাতি বলা যেতে পারে। বাঘ শুধু প্রাণী নয় আমাদের সামাজিক জীবনে মিশে থাকা বীরত্ব এবং সাহসের প্রতীকও।

আমরা বীরত্বের কথা বলতে গিয়ে বাঘকেই তুলে ধরি। ছোটোবেলায় আমরা ভাবতাম বাঘের ডেরা সুন্দরবন, সেই বন খুব সুন্দর নিশ্চয়। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার কারণে মানবচক্ষুর অন্তরালে চুপিসারে নিজেকে বাঁচানোর জন্য পালাতে হচ্ছে বাঘকে। হন্যে হয়ে খুঁজছে বাসস্থান। আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলা চলে। কোথায় থাকবে বাঘমামা, এই চিন্তায় ঘুম উড়েছে বাঘ মামার। অথচ সেই খবর কি রাখি আমরা ! দিনের পর দিন কত বাঘ শিকার হচ্ছে চোরাকারবারিদের ! ধ্বংস করা হচ্ছে বন জঙ্গল। আর তাতেই হতাশায় বাঘ প্রজাতি। বাঘ মামার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবার পেছনে যে আমরাই দায়ী ! ডব্লিউডব্লিউএফ এর পরিসংখ্যান অনুসারে, গত শতাব্দীতে বিশ্বব্যাপী বন্য বাঘের সংখ্যা প্রায় ৯৬ শতাংশ কমে গেছে। দিনের পর দিন এভাবে বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। উনিশ শতকের শেষে ভারতে ৪০ হাজারের মতো বাঘ ছিল। কিন্তু শিকার ও নির্বিচারে বাঘ মারার ফলে তা ভয়ংকরভাবে কমে যায়। তখন দেশে বনের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। ক্রমশ, জনসংখ্যা বেড়েছে। বনের পরিমাণ কমেছে। বন্যজন্তুরাও বিপাকে পড়েছে। বাঘের প্রজাতি প্রায় বিলুপ্তির মুখে।

তবে বাঘকে নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে আমাদের দেশে, তাতে বাঘ বাঘিনি,শাবকদের সংরক্ষন করা হয়। ২০১৮ সালের গণনা অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৬৭। তবে ২০২২ সালে গণনা অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৬৭। বাঘ সংরক্ষন করতে হলে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকে। বিশেষজ্ঞদের মতে ১) বাঘের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি চোরা শিকারিদের বাঘ হত্যা ও পাচার। এগুলো বন্ধ করতে হবে। বনদফতর গুলোকে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। ২) সুন্দরবনের যেসব এলাকা অপরাধপ্রবণ এবং চোরাকারবারিদের রুট হিসেবে ব্যবহার হয় সেইসব এলাকায় সিসিটিভির পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। ৩) বাঘেদের মধ্যে ঝগড়া হতেই পারে। বাঘ বাঘিনির মধ্যে মনোমালিন্য হলে, তাঁদের লোকালয়ে দেখা গেলে বনদফতরে খবর দিতে হবে, তাঁদের হত্যা বন্ধ করতে হবে। ৪)খাদ্যের অভাবেও বাঘের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই বাঘের খাদ্য হিসেবে প্রাণী সংরক্ষণ করতে হবে। ৫) বাঘের অস্তিত্বের অন্য়তম উৎস হল আবাস্থল এবং পরিবেশ। বনজঙ্গল ধ্বংস করা বন্ধ করতে হবে, পাশাপাশি বাঘেদে’র থাকার পরিবেশ যাতে বিনষ্ট না হয় সেইদিকে নজর রাখতে হবে। ৬) সুন্দরবনে বসবাসকারী লোকালয়ে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দিতে হবে, যাতে বাঘ লোকালয়ে ঢুকতে না পারে। ৭) লোকালয়ে আসা বাঘ যাতে নিরাপদে বনে ফিরে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। ৭) বাস্তুতন্ত্রের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ৮) বাঘ যেহেতু জলে থাকতেও পছন্দ করে ,জল তেষ্টা পেলে নদী,খাল,বিলের পাড়ে দেখা যায়। তাই যাতে কোনরকম বিঘ্ন না ঘটে সেইদিকে নজর রাখতে হবে।

বাঘেদের প্রেমিকা, বাচ্চা আছে। তাদের ও পরিবার পরিজন আছে। পশু হলেও খুব বিশ্বস্ত হয় এরা সম্পর্কে। একটি বাঘ তার পরিবারের জন্য সবকিছু করতে পারে। ছোটো অবস্থায় বাঘশাবক শিকার করতে পারে না, মা বাবা তাদের জন্য শিকার ধরে নিয়ে এসে শাবকদের মুখে অন্ন তুলে দেয়। একটু একটু করে শিকার ধরতে শেখায়। তাদের বাচ্চাকে বড় করে তোলে। তবে কখনো কখনো আত্মরক্ষার তাগিদে মানুষের ওপর হামলা করতে দেখা যায়। তবে তাদের বিরক্ত না করাই ভালো। নিজেদের মত বনে থাকতে দেওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *